মহাকাশের গভীর সুর শোনার নতুন উপায়
মাঝসমুদ্রে একটা ছোট নৌকায় ভেসে থাকার কথা ভাবুন। চারপাশ নিস্তব্ধ মনে হলেও গভীর জলের নিচে বিশাল তিমিরা গান গাইছে। কিন্তু আমাদের কান সেই ধীর ও গম্ভীর সুর ধরতে পারে না। মহাকাশের বিশাল ঘটনাগুলোর শব্দও ঠিক এমনই, যা আমরা এতদিন শুনতে পেতাম না।
এতদিন আমরা মহাবিশ্বের শব্দ শোনার চেষ্টা করেছি যেন কোলাহলপূর্ণ সৈকতে দাঁড়িয়ে। সেখানে ঢেউ আছড়ে পড়ার চড়া শব্দ শোনা যায়, কিন্তু গভীর সাগরের ভারী দুলুনি বোঝা যায় না। পৃথিবীর মাটি সবসময় কাঁপছে, তাই মহাকাশের সেই গভীর সুর এখানে এসে হারিয়ে যায়।
সেই গভীর সুর শুনতে বিজ্ঞানীরা এবার কান পাতছেন মহাকাশের নির্জনতায়। তিনটি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট একে অপরের থেকে লক্ষ মাইল দূরে ভেসে থাকবে। এরা অদৃশ্য তারের বদলে লেজার রশ্মি দিয়ে একে অপরের সাথে যুক্ত, ঠিক যেন সাগরের বুকে ভাসমান তিনটি শান্ত বয়া।
যখন মহাকাশের কোনো ভারী ঢেউ এদের ওপর দিয়ে যায়, তখন মাঝখানের শূন্যস্থান একটু প্রসারিত হয়। লেজারের আলো দিয়ে তৈরি এই বিশাল স্কেলটি তখন পরমাণুর চেয়েও ছোট সেই পরিবর্তন মেপে ফেলে। পৃথিবীর ছোট স্কেলে যা ধরা পড়ত না, এই বিশাল জালের টানে তা ধরা পড়ে।
কিন্তু এক কানে শুনলে বোঝা যায় না শব্দটা কোন দিক থেকে আসছে। তাই বিজ্ঞানীরা দূরে আরেকটি একই রকম ব্যবস্থা বসাচ্ছেন। দুই জায়গার এই 'স্টেরিও' শোনার ব্যবস্থা থাকলে আমরা ঠিক বুঝতে পারব মহাকাশের কোন কোণ থেকে সেই বিশাল সংকেত ভেসে আসছে।
শুধু তাই নয়, দূরের যেসব তারা বাতিঘরের মতো নিয়মিত জ্বলে আর নেভে, সেগুলোর দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। পুরো মহাকাশ যদি সাগরের মতো একসাথে দুলতে থাকে, তবে এই তারার আলোর ছন্দেও তার ছাপ পড়বে। এতে মহাবিশ্বের একদম গোড়ার দিকের গুনগুন শব্দও শোনা যাবে।
আমরা আর সৈকতে দাঁড়িয়ে নেই। মহাকাশের গভীর নির্জনতায় এই নতুন কান পেতে আমরা এখন মহাবিশ্বের পুরো ইতিহাস শুনতে প্রস্তুত। যে বিশাল সুর এতদিন নীরবে বেজে চলেছিল, তা অবশেষে আমাদের কাছে ধরা দিতে শুরু করেছে।