মহাকাশের হারানো সুর
গোধূলি বেলার গভীর জঙ্গলের কথা ভাবুন। আপনি ঝিঁঝিঁ পোকার তীক্ষ্ণ ডাক আর দূরের মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন সহজেই শুনতে পান। কিন্তু মাঝখানের শব্দগুলো, যেমন পাখির ডাক, আপনার কানে আসছে না। এর কারণ পাখি নেই তা নয়, বরং সেই নির্দিষ্ট সুর ধরার মতো সঠিক যন্ত্র আমাদের নেই।
মহাবিশ্বের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা ঠিক এই সমস্যায় পড়েছেন। আমরা ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনতে পাই, আবার খুব ধীর লয়ের কম্পনও মাপতে পারি। কিন্তু মাঝখানের এক বিশাল নীরবতায় এই মহাজাগতিক দৈত্যরা কীভাবে বড় হলো, সেই ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে।
এই শূন্যস্থান পূরণ করতে 'তিয়ানকিন' নামের এক নতুন মিশন আসছে। এরা সূর্যের বদলে পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরবে। তিনটি উপগ্রহ আকাশে একটি নিখুঁত ত্রিভুজ তৈরি করবে। লেজার রশ্মি দিয়ে এরা একে অপরের সাথে যুক্ত থাকবে, যেন অদৃশ্য তারের মাধ্যমে মহাকাশের কম্পন ধরা যায়।
এই ত্রিভুজটি সেই হারানো মাঝখানের সুর ধরার জন্য তৈরি। এতে আমরা ব্ল্যাক হোলের 'শৈশব' শুনতে পাব। পাখির ডাক শুনে যেমন বোঝা যায় সে বাসায় আছে নাকি উড়ছে, তেমনই এদের কম্পন দেখে বোঝা যাবে তারা একা বড় হয়েছে নাকি ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে।
পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরার একটা বড় সুবিধা হলো সব সময় যোগাযোগ থাকা। দূরের স্টেশনগুলো মাঝে মাঝে রেঞ্জের বাইরে চলে যায়। কিন্তু এরা কোনো বড় ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সংকেত পাঠাতে পারবে, যাতে পৃথিবীর টেলিস্কোপগুলো ঘুরিয়ে আমরা সেই দৃশ্য সরাসরি দেখতে পারি।
এই মাঝখানের সুরগুলো শুনে আমরা মহাবিশ্বকে আর শুধু হঠাৎ ঘটা সংঘর্ষ হিসেবে দেখব না। আমরা বিবর্তনের পুরো গানটা শুনতে পাব। মহাজাগতিক দৈত্যদের জন্ম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো গল্পটা তখন টুকরো ছবি না হয়ে একটানা সিনেমার মতো পরিষ্কার হয়ে উঠবে।